. .
সায়মুন ডেস্ক
প্রকাশ : Jul 13, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতি: যেখানে শুকাচ্ছে, সেখানেই ক্ষতচিহ্ন

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায়। তবে বৃষ্টি থেমে গেলেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানিবন্দি পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পানি নামতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার রেখে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন, দুর্ভোগ আর মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র।

উপজেলার সদর ইউনিয়ন, টইটং, রাজাখালী, বারবাকিয়া, মগনামা, উজানটিয়া ও শিলখালী ইউনিয়নসহ পেকুয়া পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েকদিন আগেও ছিল পানির নিচে। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও ভাঙা সড়ক, কাদায় ঢেকে থাকা বসতঘর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া গৃহস্থালির সামগ্রী মানুষের সামনে নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পরও অনেক এলাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকার অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন স্লুইসগেট দখল করে রাখা এবং সেখানে জাল বসিয়ে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। ফলে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং অনেক গ্রাম দিনের পর দিন পানিবন্দি অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতার অভাবে স্লুইসগেট উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। তাদের সরব উপস্থিতি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্লুইসগেট উন্মুক্ত করা হয়। এ সময় পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা জাল ও বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়। স্লুইসগেট খুলে দেওয়ার পর বেশ কিছু এলাকায় দ্রুত পানি নামতে শুরু করে।

এদিকে বন্যার মধ্যে ত্রাণের জন্য হাহাকার চললেও বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হলেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেলেও পেকুয়া পৌরসভার বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল এখনও পানির নিচে রয়েছে। এসব এলাকার মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

রাজাখালী ইউনিয়নের এক পানিবন্দি নারী বাসিন্দা রোজিনা (ছদ্মনাম) জানান, তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে একাই বসবাস করেন। বন্যার সময় বাড়ির ভেতরে পানি উঠে যাওয়ায় সন্তানদের নিয়ে বাড়ির উঁচু অংশে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। তার ভাষ্য, বাচ্চারা দিনের পর দিন ভেজা পরিবেশেই ঘুমিয়েছে। একদিন রান্না করা খাবার পেলেও এরপর আর কোনো ত্রাণ সহায়তা তার কাছে পৌঁছেনি।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও ঘরের ভেতরে জমে থাকা কাদা ও ময়লার কারণে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের অধিকাংশ কাপড় এখনও ভেজা অবস্থায় রয়েছে। আগে থেকেই তিনি মাটির চুলায় রান্না করতেন। কিন্তু বন্যার পানিতে জ্বালানি কাঠ ভিজে যাওয়ায় এখন রান্না করার মতো কোনো সুযোগ নেই। ফলে সন্তানদের নিয়ে সীমাহীন কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে তাকে।

রোজিনা বলেন, “পানি নামছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের কষ্ট তো কমেনি। ঘরে কাদা, কাপড় ভেজা, কাঠ ভেজা। রান্না করার উপায় নেই। এইভাবে আর কতদিন কাটাতে হবে জানি না।”

পেকুয়া সদর বলীরপাড়ার বাসিন্দা সামশুল আলম জানান, তাদের গ্রামে এখনও পানি রয়ে গেছে। নৌকা ব্যবহার করেই যোগাযোগ করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠন মাঝে মধ্যে ত্রাণ নিয়ে গ্রামে আসছেন। তবে রান্না করে স্বাভাবিকভাবে খাওয়ার মতো পরিবেশ কবে তৈরি হবে, তা নিয়ে এখনও উদ্বিগ্ন রয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সাংবাদিক ছাফওয়ানুল করিম বলেন, “টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার মাঝেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি স্লুইসগেট বন্ধ করে রেখেছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।” পাশাপাশি ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দারা উপজেলার সব স্লুইসগেটের ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

কৃষি ও মৎস্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি, সবজি ক্ষেত, পুকুর ও মাছের ঘের বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক ও খামারি তাদের বছরের সঞ্চয় হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

বন্যার পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন সামনে আসছে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। অনেক পরিবার এখনও ঘর পরিষ্কার, বসতঘর মেরামত এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সংগ্রাম করছে।

উপজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য—যেখানে পানি শুকাচ্ছে, সেখানেই ভেসে উঠছে বন্যার ক্ষতচিহ্ন। ভাঙা সড়ক, কাদায় ঢেকে থাকা বাড়িঘর, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা রোধে স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টেকনাফ সীমান্তে গুলিবিদ্ধ শিশু হুজাইফার ২৭ দিন পর মৃত্যু

1

পেকুয়ায় সড়ক বন্ধ করে ট্রাকে লবণবোঝাই: ট্রাকচালককে জরিমানা

2

সৈকতে টর্নেডোর তাণ্ডব, ভাঙল অর্ধশতাধিক চেয়ার-ছাতা

3

নাফ নদীতে স্থবিরতা ভেঙে টেকনাফ বন্দরে বাণিজ্য ফেরাতে উদ্যোগ

4

‘বেহেস্তের টিকিট বিক্রিকারীরা আবার ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে হাত মি

5

মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আহমেদ আযম খান

6

শেষ সভার জনসমুদ্রে উখিয়া-টেকনাফে আনোয়ারীর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ঘ

7

টেকনাফে বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার, ৩২৭ গুলিসহ রোহিঙ্গা নারী আটক

8

কক্সবাজারের চারটি আসনে ১০ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত

9

সমিতিপাড়ায় সেলুনকর্মী সুকান্ত হত্যা মামলার পলাতক আসামি গ্রেপ

10

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ৪ জনের দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু

11

আলীকদমে বিজিবির উদ্যোগে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ

12

বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি: ২ জেলের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ২

13

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড

14

টেকনাফে ইয়াবাসহ মাদক কারবারি আটক

15

কাফনের কাপড়সহ বিএনপি প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীকে চিঠি, হাদির

16

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত

17

চকরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুর মৃত্যু

18

জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিতের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

19

কক্সবাজার -০৪: উখিয়া-টেকনাফের ভোটার কতো,ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ক

20