টেকনাফ প্রতিনিধি
কক্সবাজার সীমান্তে ইয়াবা পাচারে আবারও অভিনব ও চাঞ্চল্যকর কৌশলের সন্ধান পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। নাফ নদী দিয়ে রশি ও ডুবন্ত কাঠের বাক্স টেনে আনার পর এবার ২ কিলোমিটার স্টিলের তার, কপিকল, ইলেকট্রিক মোটর ও ব্যাটারি দিয়ে পানির নিচ দিয়ে ইয়াবা পাচারের চেষ্টা করছিল মাদক কারবারিরা।
উখিয়া ৬৪ বিজিবি'র পালংখালী ও বালুখালী বিওপি'র পৃথক দুটি অভিযানে এই ভয়ঙ্কর পাচার কৌশল ফাঁস হয়। এ সময় ৩ জন আসামিসহ ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগাজিন, ১১ রাউন্ড গুলি এবং ২ লক্ষ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
আজ মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর ) প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম।
বিজিবি জানায়, চোরাকারবারিরা মিয়ানমার থেকে কাঠের তৈরি একটি বিশেষ ডুবন্ত ক্যারিয়ার (বাক্স) বানায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই একটি বাক্সের ভেতরেই একসাথে প্রায় ৩০ লক্ষ ইয়াবা আনা সম্ভব।
ওই বাক্সটি পানির নিচ দিয়ে টেনে আনার জন্য ব্যবহার করা হয় ২ কিলোমিটার স্টিলের তার, ৯টি কপিকল, উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক মোটর। মোটর দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার টেনে ক্যারিয়ারটি বাংলাদেশের দিকে নিয়ে আসা হয়।
নাফ নদী পার করে পালংখালীর ফাইস্যা খাল হয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে তারা। খাল আঁকা-বাঁকা হওয়ায় কপিকল ও তারের সমন্বয়ে খালকে কয়েক খণ্ডে ভাগ করে সোজা করে টেনে আনে। এক কারবারি পানিতে হাত দিয়ে মাছ ধরার ছলে ক্যারিয়ারের সাথে সাথে আসে এবং প্রতিটি বাঁক অতিক্রম করার সময় ছোট কপিকল খুলে দেয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। এটি একটি উচ্চ প্রযুক্তির ও পরিকল্পিত পাচার কৌশল।
গেল ১২ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টায় পালংখালী বিওপির টহল দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উখিয়ার আঞ্জুমান পাড়ায় মনিরের ঘেরের মাচাং ঘরের পাশে ৪-৫ জনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া করে বেলাল উদ্দিন (৩৫) ও খোরশেদ আলম (২৬) কে আটক করা হয়। পরে সেখান থেকে অস্ত্র ও ডুবন্ত ক্যারিয়ার তৈরির সরঞ্জাম - স্টিলের তার, কপিকল, মোটর ও ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়।
অপরদিকে আজ ১৩ অক্টোবর ভোর ৩টায় বালুখালী বিওপি সোহেলের ঘের এলাকায় আরেকটি অভিযান চালিয়ে মো. রকি আহমেদ (২৬) কে ২ লক্ষ পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে আটক করে বিজিবি। একই সাথে পালংখালী থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় আরও ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে ৬৪ বিজিবি'র অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "বিজিবির কঠোর তৎপরতার কারণে মাদক কারবারিরা এখন অভিনব পদ্ধতি নিচ্ছে। গত ৯ সেপ্টেম্বরও একই এলাকায় রশি দিয়ে ডুবিয়ে ১৪ লক্ষ ইয়াবা আনার সময় আমরা আটক করেছিলাম। এবার তারা আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।"
তিনি আরও জানান, "সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এ বছরেই ৬৪ বিজিবি প্রায় ১ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ও ২২৮ জন আসামি আটক করেছে।"
স্থানীয়দের মতে, নাফ নদী ও ফাইস্যা খালের দুর্গমতা এবং জোয়ার-ভাটার সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে। শুধু টহল বাড়িয়ে নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ালেই এই ডুবন্ত কন্টেইনারের মতো অভিনব পাচার ঠেকানো সম্ভব হবে।