টেকনাফ প্রতিনিধি
ধর্ম যার যার, উৎসব সবার - এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে সীমান্তের শেষ জনপদ টেকনাফে শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সীমান্তের মানুষ।
কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে অশ্রুসিক্ত নয়নে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মায়ের বিদায় বেলায় চোখে জল, কিন্তু মনে আগামী বছরের অপেক্ষা।
বিকেল ৩টা থেকেই প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ঢল নামে। উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপ - টেকনাফ কেন্দ্রীয় বিষ্ণু মন্দির, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সাবরাং সহ ১২টি মণ্ডপ থেকে একে একে দেবী দুর্গার প্রতিমা ট্রাকে করে শোভাযাত্রা সহকারে সৈকত প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়।
এ সময় ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা, সিঁদুর খেলা আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো টেকনাফ সৈকত এলাকা। বিবাহিত নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন, মিষ্টিমুখ করান। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠে শেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর "আসছে বছর আবার হবে" স্লোগানে মুখরিত ছিল চারপাশ।
বিসর্জন অনুষ্ঠানে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নয়, স্থানীয় মুসলিমসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ সমবেত হন। সৈকতে দাঁড়িয়ে মুসলিম-হিন্দু একসাথে প্রতিমা বিসর্জন দেখেন, ছবি তোলেন। যা এক চমৎকার অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধনে পরিণত হয়। টেকনাফের মতো স্পর্শকাতর সীমান্তে এই সম্প্রীতি সারা দেশের জন্য উদাহরণ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, "আমরা এখানে সবাই মিলেমিশে থাকি। ওদের পূজা, আমাদের ঈদ - সবই আমরা একসাথে উদযাপন করি। আজকে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে এসেছি, খুব ভালো লাগছে।"
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে সৈকতজুড়ে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিজিবি, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, র্যাব এবং আনসার বাহিনীর টহল ও নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও টেকনাফ মডেল থানার ওসি নিজে উপস্থিত থেকে পুরো বিসর্জন কার্যক্রম তদারকি করেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
টেকনাফ কেন্দ্রীয় বিষ্ণু মন্দির পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রুপন ধর বলেন, "অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের পূজা এবং প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয় সকলের সহযোগিতায় আমরা নির্বিঘ্নে আমাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পেরেছি। এ জন্য উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি এবং টেকনাফের সর্বস্তরের মানুষকে ধন্যবাদ জানাই।"
তিনি আরও বলেন, এবার টেকনাফে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পূজা শেষ হয়েছে, যা আমাদের সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে ধর্মীয় রীতি মেনে বঙ্গোপসাগরের লোনাজলে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা। ঢেউয়ের সাথে ভেসে যায় প্রতিমা, শেষ হয় মর্ত্যে দেবীর ৫ দিনের আগমন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। এখন আবার এক বছরের অপেক্ষা।